নিবিড় ক্যাম্পাস। সব কিছুই চুপচাপ, একদম নিরব। স্থানে স্থানে জোড়ায় জোড়ায় প্রেমাসনে বসে আছে কতিপয় স্থায়ী-অস্থায়ী জুটি। কারো চোখে আগুন, কারওটা প্রানবন্ত। বিশেষ করে মেয়েদের। ওদের বহিঃপ্রকাশটা বেশ পরিষ্কার হয়। তাই ওরা চাইলেও পরিমিত পাপ করতে পারেনা।
শ্রাবস্তী নামের একটা মেয়ে বসে আছে চৌ-রাস্তার কাছাকাছি মাঠে। সুবিধে একটাই এখান থেকে সব দেখা যায়। যেদিকে ইচ্ছে সেইদিক দেখা যায়। চোখে চশমা, তাই দৃষ্টি ধরা যায় না। কেউ বিরক্তিও বোধ করেনা। ও বসে বসে, চেয়ে-চেয়ে সকল প্রানের একনিষ্টভাবে খেলা যাওয়া পাগলামির শেষ পদস্থ খেলা দেখছে, অথবা উপভোগ করছে। তা হয়তো ঠিক নয় কোন কোনটায় বেশ বিরক্ত হছে। সেগুলো বোধ হয় ন্যাকামি।
গেল তিন বছর এই বিশেবিদ্যালয়ে পড়ছে। একাডিমিক লেখাপরা অকে দিয়ে হবেনা। তাই ছবি আকাআকি করে । আকেও অদ্ভুত। আর এই কদিনে ওর অজশ্র বন্ধু এসেছে। ছেলে মেয়ে। ঝাল মুড়ি। কেউ কেউ, যারা ছেলে তাদের ভিতরে অনেকে সম্পর্কের উন্নতি করতে চেয়েছে। ওর কোনোদিন বিষয়টার আমেজ ভালো লাগেনি। মেনেও নেয় নি। দুদিন চাপা অভিমান, বা একটু রাগ দেখালে তারা পরে আর কেউ আসেনি। দু চার জনকে ওর বেশ ভালোও লেগেছিল। কিন্তু সে বিষয়ে, প্রকাশ ঘটানোকে নিজের অপমান ধরে নিয়ে চেপে গিয়েছে। হাতটা একদিন খুলে দিতে হয় এই তত্ত্বে সে বেশ বিশ্বাসী। তাই অনেক বন্ধু গেল অনেক এল, বিদায়ীবেলাতে ও অতটা ভেঙ্গেও পরেনি। নিছক মন খারাপদের দলে কিছুটা সময় পার করেছে। তাছাড়া ও খুব শক্ত। ছোট বেলা থেকে ওর বাবা-মা নেই কিনা।
কিন্তু প্রথম থেকে ওর একটা বন্ধুকে বিশেষ ভালোলাগে। ছেলেটা দেখতেও বেশ। আর মানুষ হিসেবে অসাধারন। ওর জন্যই অপেক্ষা করছে শ্রী। শর্ট করে ছেলেটা ওকে এই নামেই ডাকে। শ্রী এর মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় আর সবার মতো গাছের নিচে বসে প্রেমিকের কোলে মাথা রেখে সুখ দুক্ষের আলাপ করতে। রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে, বাদাম ছিলতে,আর অনর্থক বিষয়ে বিস্তর তর্ক করতে। কিন্তু মিথুন নামের সাদাসিধে,স্টেট-কাট কথা বলা ছেলেটা কখনোই এই ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় নি। একবার শ্রী ভাবলো, নিজেই বলবে, ভালোবাসার কথা। রাজী হলে ভালো নাহলে ? না শ্রীকে জিততেই হবে। ভালোবাসায় রাজী না হলে লীভ টুগেদারের কথা বলবে। তখন নিশ্চই রাজী হবে। নিজের গায়ের স্মেলের উপর ভরসা আছে শ্রীর। একসাথে কয়েকদিন থাকলে প্রেমে পরে যাওয়াটা অস্বাভাবিক না। অনেকটা বাধ্য। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া একটা ভার্জিন মেয়েকে কে ছাড়তে চায় ? কিন্তু বলতে গিয়েও পারেনি, বার বার বাধা দিয়েছে একটা কাল্পনিক মেয়ে। যাকে শ্রী কখনোই দেখেনি। মেয়েটা মিথুনের প্রথম প্রেম। বসন্তের ক্লাস পালানো দিনগুলোতে, শিক্ষাভ্রমনে রাঙ্গামাটির পাহারের ভাজে, কত রাতজাগা রাস্তায় হাটতে হাটতে,কতবার ভেবেছে শ্রী অব্যক্ত কথাটা যা এখন কাগজে লেখা হাতে ধরিয়ে দিবে। কিন্তু বাধা দিয়েছে ওই প্রথম প্রেমে গল্পের রস। ওদের ছোয়া, জেগে থাকা,একসাথে পথ চলার গল্পগুলো মিথুন সাজিয়ে বলে সুন্দর। কিন্তু ওই লাভা গিলতে কষ্ট হয় শ্রীর। অথচ মুখ বুঝে সহ্য করে। মেয়েদের যা স্বভাব। অনেক ভেবেছে শ্রী। সব গল্পের একটা শেষ আছে, তাইনা। অথচ মিথুন গল্পগুলোকে বলেই যাই, আর বলেই যায়। এক গল্প অর কাছে এতবার করে বলার কি আছে।
এক জুটি একে অপরকে কিস করছে। কোনো এক সাহিত্যিক বলেছিলেন, প্রকৃতির অক্সিজেন যখন ফুড়িয়ে যাবে তখন দরকার পরবে অজশ্র চুমুর। চুমুতে চুমুতে বেচে থাকতে হবে। আর সেই উতসব ঘটা করে পালন করা হচ্ছে,জনসম্মুখে। দেখতেই শ্রীর গা গুলিয়ে উঠলো। একদম বিরক্তিতে নয়। অপরিসীম ভালোলাগায়। ঠোটে ঠোট মিলানো, মেয়েটার চোখ বন্ধ,ছেলেটা চোখ খুলে চেয়ে দেখছে, মনে হচ্ছে খোলা চোখে মেয়েটাকে আদর করছে। শ্রীর ইচ্ছাশক্তি আরও প্রবল হয়ে উঠলো। শ্রীর যেকোনো সুন্দর ছেলে দেখলেই তাকে ডেকে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, এই ছেলে একটু আদর করবে, ওই ছেলেটার মতন, চোখ খুলে চুমু দেবে।
মিথুন এসেই শ্রীর পাশে বসে পরলো। হাতে জীবনানন্দ। শ্রীর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। এখন শুরু হবে কাব্য চর্চা। যেভাবে হোক ওকে ঠেকাতে হবে।
" তুই কি এখন এসব পড়বি মিথ " শর্ট করে মিথুনকে মিথ ডাকে ও।
" হিম" মাথা ঝাকিয়ে বললো মিথুন।
" না, একদম না। আমি এখানে তোকে একটা দরকারী কাজে ডেকেছি "
" মেয়েদের ১২ মাস দরকারী কাজ থাকে। "
" আমাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবি না। নাকি একা একাই যাব ? "
" নিয়ে যাব। কি খাওয়াবি? দেখ! দেখ! শ্রী ! গাছতলার ছেলেটা মেয়েটাকে একদম ফাটিয়ে ফেলছে "
" দেখেছি। এখন নিশ্চয়ই বলবি তোর প্রথম প্রেমকে এভাবে করেছিলি।"
"তুই একটা মাইন্ড রিডার। কিভাবে বুঝলী। পুরোপুরি এভাবে না অনেকটা এভাবে। "
" চল,চল চল। পরে আর ডাক্তারকে পাওয়া যাবেনা। "
ওরা হাটছে। বিষন্নতায় ভরে গেছে শ্রীর মন। মিথের প্রথম প্রেমটাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে। ওই কুত্তি না থাকলে মিথ শুধু ওর ই হতো। তিন বছরের প্রেম ময় জীবনে কুত্তি করে নাই এমন কিছুই নাই। মাঝে মাঝে মনে হয় মিথ বানিয়ে বানিয়ে বলে, কিন্তু গল্পের বলার ভঙ্গি আর চোখের প্রান্তবন্ততা দেখলে ভুল ভেঙ্গে যায় নিমিষেই।
ওরা এখন রিকাসায়। ব্যস্ত শহরের কোলাহলে হারিয়ে যাচ্ছে কত গল্প, সেই কথাই ব্যাখা করছে মিথ শ্রী-কে।
" মিথ, মেয়েটাকে তুই খুব ভালোবাসতি তাই না ? আচ্ছা তোদের মোট কতবার সেক্স হয়ে ছিল "
" গুনে রেখেছি না নাকি আমি। হবে গোটা ২০-২৫ বার "
" মেয়েটার খোজ নিশ এখনো ? কোথায় থাকে ?"
" হাজারবার বলেছি, ও হঠাত করে একদিন হারিয়ে গেছে। খুজে পাই নি "
' এবার এবং হাজারবার মিথ্য বলেছিস। যে মেয়ের সাথে এত ঘনিষ্টতা সে হুট করে হারিয়ে যাবে আর তুমি ঠিক পাবেনা। তার খোজ পাবেনা। আমি বিশ্বাস করিনা। যতদিন সত্যি না বলবি, আমার কোনো শান্তি নেই "
" সত্যি বলছি। একদিন হঠাত করে হারিয়ে গেল। আর খুজেই পেলাম না। "
" তুই একটা কিছু লুকিয়ে যাস। নাম বললে হয়তো মেয়েটাকে চিনে ফেলবো তাই বলিস না। হোক, আমার তাতে কিছু যায় আসে না। সবারই অতীত থাকে, এতে অবস্বাদের কিছু নেই "
" বেশ তো। আইস্ক্রিম খাবি "
" বেশ তো। আইস্ক্রিম খাবি "
" না। "
" গু খাবি "
" গু খাবি "
" না "
এমন সময় হঠাত করে একটা ফোনা আসলো। মিথ রিসিভ করতেই অর মুখটা কালো হয়ে গেল। একটা চিকন কন্ঠ ওইদিক থেকে কেদে কেদে কিসব বলছে। হালকা আচ পেল শ্রী। মিথের চেহারা দেখে ওর বুখের ভিতরে পুড়ে উঠলো। ভেবে নিল, হারিয়ে যাওয়া প্রথম প্রেম ফোন দিয়ে আবার ফিরে আসতে চাইছে। শ্রীর প্রচুর কাদতে ইচ্ছে হলো। কিছুই জিজ্ঞেস করলো না। মিথ ফোনটা ছুড়ে ফেল দিল। টুকরো টুকরো হয়ে গেল সেটা।
ডাক্তার দেখানো শেষ হলে, শ্রীকে হলে দিয়ে আসলো, মিথ।
হলের জালনায় বসে কেদে আকাশ মাটিতে মিশিয়ে ফেললো শ্রী। কেন মেয়েটা আবার ফিরে আসলো ? কেন ? কেন ? শ্রীর মনে হলো, কোনো কিছু সঠিক না জেনে এভাবে সীধান্ত নেওয়া ঠিক না। ও ফোন দিল, ফোন বন্ধ পেয়ে বন্ধুর ফোনে দিল।
" আচ্ছা মিথ, মেয়েটা কি ফিরে এসেছে?"
" না আসেনি, কিন্তু আসবে। এইতো আর কিছুদিন। আমি তোকে কথা দিলাম, ওকে যেভাবে হোক ওকে ফিরিয়ে আনবো, আমি ছাড়া যে ওর আর কেউ নেই। "
" না আসেনি, কিন্তু আসবে। এইতো আর কিছুদিন। আমি তোকে কথা দিলাম, ওকে যেভাবে হোক ওকে ফিরিয়ে আনবো, আমি ছাড়া যে ওর আর কেউ নেই। "
" যদি না আসে। তাহলে কি তুই অপেক্ষা করবি "
" হিম। চেষ্টা করলে তা ব্যর্থ হবার সম্ভাবনা কম। আমি পুর্ন চেষ্টা করছি।"
" আচ্ছা, রাখি "
শ্রীর শরীর ঘামে ভিজে গেল। তুই ছাড়া ওর কেউ নেই। আমার কে আছে জানোয়ার। ওই মেয়েতো একবার ছেড়ে গেছে আবার যাবে। আর আবার তুই অপেক্ষা করবি। তাহলে আমার কি দরকার। আমি কেন এত কষ্ট পাব।
মিথ কাদেনি অনেক দিন হলো, আজ চোখ ফেটে ঝর্না বেয়ে এল। দুপুরে ফোনে এসেছিল মৃত্যু সংবাদ। শ্রীর মামা-মামি ক্রিমিনালদের হাতে খুন হয়েছে ব্যবসাজনিত সমস্যায়। এই খবর শ্রীর একমাত্র বন্ধু ও আন্তীয় মিথকে জানানো হলো। মিথ শ্রীকে বলেনি, কারন ডাক্তারের কড়া নিষেধ আছে সকল প্রকার মানসিক আঘাত থেকে ওকে মুক্ত রাখতে। ৬ বছর আগে, শ্রী আর ওর পরিবার গ্রামে বেড়াতে যাবার সময় লঞ্চ দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়। মারা যায় সকলে বেচে থাকে শ্রী। আর শ্রীকে আশ্রয় দেয় ওর এই মামা-মামি। কিন্তু সব কিছু হারিয়ে ধিরে ধিরে শ্রী মানসিক সমস্যায় ভুগতে থাকে। পরে রোগের প্রভা্ব সর্বত্ত্ব ছড়িয়ে পরলে ও প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে যায়। ব্রেনে প্রচুর চাপ পরে এবং ভুলে যায় শেষ কটা বছরের স্মৃতি। পরে দেশে নানা চিকিতসায় ওকে সুস্থ করা হয়। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া অনেক স্মৃতি আর ফিরে পাই নি। ওকে ভুল বোঝানো হয়, যে ওর বাবা মা দুজনেই অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। ভর্তি করে দেওয়া হয় চারুকলায়। ছবি একে দিন পার করতে থাকে। দেখা হয়ে যায় মিথের সাথে। চিনতে পারে না। এই সেই মিথ, যারা সাথে ভালোবাসায় ভাসিয়ে দিয়েছিল জীবন। পরে মিথ সব জেনে নিয়ে ওকে সঞ দেওয়া শুরু করে, নিয়মিত ডাক্তার দেখায় ওর স্মৃতি ফিরিয়ে আনার জন্য। অনেক কষ্টের টাকা জোগাড় করে বিদেশে চিকিতসার জন্য। ওর স্মৃতি ফিরিয়ে এনে , আবার নতুন করে শুরু করবে সব কিছু। প্রাথমিক চিকিতসা হিসেবে ওর সামনে ওদের ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটা ঘটনা মিথ বর্ননা করে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়না। এবার শেষ চিকিতসার পালা।
মিথ বুকে জমাট কষ্ট পেলে পুশে বেচে আছে বেশ। কারন ওর গভীরে একটা আশা আছে। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে শ্রীকে।
ঠিক এই সময়ে একটা ফোন আসলো মিথের বন্ধুর ফোনে " ভাইয়া একবার হলে আসবেন, শ্রাবস্তি সুইসেড করেছে "
No comments:
Post a Comment