ঢাকা শহরে থাকা মানে কদিন পর পর বাসা চেঞ্জ করা। সম্প্রতি এই বাসাটাতে এসেছি। এই ৫ মাস। এটা চেঞ্জের কথা উঠতেই আমি বাসায় এক চান্স ঝগড়া বাধালাম । এই বাসার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করলাম। এটা সেরা বাসা, দক্ষিন দিক খোলা। ছাদে যাওয়া যায়, স্কুল কাছে,কোচিং কাছে, সংরক্ষিত এলাকা।
ভেবেছিলাম কেউ শুনবে না। কিন্তু কেন যেন এবার বাসা চেঞ্জ করা হলনা। এই বাসা চেঞ্জ করলে আমার অবস্থা শোচনিয় হয়ে যেত। কারন এই সেই বাসা। যেখানে সৃষ্টি হয়েছে আমার পৃথিবীতে সম্পুর্ন একটা নতুন শহর। এই বাসাতে আসতেই আমার জীবনে এসেছে প্রেম। প্রপোজ অনেক পেয়েছি। কাউকে মন দিতে ইচ্ছে হয়নি। কিন্তু এবার দিয়ে দিলাম। সে আমার সামনের বাসায় থাকে। বন্ধুদের সবসময় বকা দিয়েছি যে, ছেলেরা খুব খারাপ, অল্প বয়সে প্রেম করিস না ওরা য়ামাকে মজা করে বলতো আচ্ছা তোর বাবা-মা তোর নাম প্রেমা কেন রেখেছে? প্রেমকে না বলার জন্য?
আর আজ সেই প্রেমাই প্রেমে পরে গেল। কাউকে লজ্জায় বলতেও পারছি না। কতজনকে বকা দিয়েছে অনলাইনে ও ফোনে প্রেম করার দায়ে। কিন্তু আমি যে তারও চেয়ে করুন প্রেমে পরে গেলাম অনলাইনেতো তাও দু চারটা ছবি দেখা যায় । কথা শুনেও কিছু আইডিয়া করা যায়। আমি এমন জনের প্রেমে পরেছি যার সাথে কথাতো দুরের কথা গত চার মাসে একবার তাকে দেখার সুযোগ পর্যন্ত হয় নাই।
আমার একদম সামনের বাসাতে থাকে ছেলাটা। কোন নাম নাই, আমি ওকে বর্ষন
বলে ডাকি। ও প্রচুর গান গায় এবং গান লেখে তাতে সুরও করে। আর রাতে গিটার
বাজিয়ে বাজিয়ে সেই গান গায়। অনেকেই জালনা দিয়ে শোনে। আমি ছাদে হাটি আর শুনি। ও এতটা অন্ধকারে থাকে যে ওকে দেখাই হয়না। অনেকে ওয়ান্স মোর ওয়ান্স মোর বলে কিন্তু কোনদিনো ও কারও ইচ্ছাপুরন করেনি। ওর যতক্ষন ইচ্ছে হয় গায়, তার পর সিগারেট খেয়েই চলে যায়।
ওর কন্ঠ মাশাল্লাহ, আর সুরতো এক কথায় অনবদ্য। আর লেখনিতো বিনদাস। ওর গাঙ্গুলোতে সাধারনতো জোনাকি,ঘাম,নিকোটিন আর বর্ষা এই শব্দগুলো থাকবেই। এই চারটা শব্দের ভিতরে আমার বর্ষা সব থেকে পছন্দ, তাই লিংগ করে ওকে আমি বর্ষন ডাকি।
এখন বাজে ৯.৫৫ । আর ৫ মিনিটের ভিতরে বর্ষন আসবে আর গান করবে।
হিম, বর্ষন এসেছে। আমি ছাদে চা নিয়ে বসে আছি। কোন জালনায় কোন মানুষ নেই। শুধু আমি আর বর্ষন।
ও গিটারে সুর তুললো। আমি খাতা কলম নিয়ে বসলাম, এটা একদম নতুন সুর। মানে নতুন গান। আমি আবার ওর সব গান লিখে রাখি। কথাগুলো বেশ ভালো আগে কিনা।
" কোথাও সুখ নাই তার, ডুবছো সাগর খুজছো পাহাড়
যদি এতই তাকে ভালোবাস যাও স্বর্গে রেখে এসো।"
বাহ বাহ।
এভাবেই কেটে যায় আমার দিন। বর্ষন তার গান গায় ইচ্ছেমত। আমি শুনি, লিখি আর ভালোবেসে যাই অবিরত। ওর স্টাইল নকল করে আমিও দু চারটা লিরিক লিখেছি। প্রেম হলে ওকে দিয়ে দেব। ও গান বানাবে। আমি গাইবো।
বর্ষন অন্যদিন আবার গাইছে,
" যেদিন তুমি হেরে যাবে, আর সবাই ছুটে পালাবে
সেদিন তুমি মু্ল্যহীন, পৃথিবী্র কিছু অক্সিজেন বাচবে।"
বর্ষন আমার বর্ষন। কথাগুলো দিয়ে ঠিক কি বোঝাতে চাও তুমি?
ওকে দেখার ইচ্ছায় আমি আকুল হয়ে গেলাম। ওকে দেখাই যেতনা। এরকম নিজেকে লুজিয়ে রাখা ছেলে বোধহয় আর নেই দুনিয়ায়। আমি ওর বাসার সামনে গিয়ে টানা ২ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকলাম, সকাল ৮ টা থেকে ১০ টা অব্দি। বিশাল গেট গিয়ে ওদের গ্যারেজ আটকানো। ফুটো ফাটা দিয়ে উকি মারতে একদম ইচ্ছে হলো না। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম।
গেট খুলে গেল। একটা গাড়ি বের হলো। গাড়ির সামনের সিটে একটা ছেলে ভালোভাবে দেখতে পেলাম না, গাড়ির পিছনে একটা গিটার। আমার আর বুঝতে বাকি রইলোনা। এই আমার বর্ষন। ইস দুক্ষ হচ্ছে, কেন একটু ভালোভাবে দেখলাম না। এর পরে অনেকদিন চেষ্টা করলাম, কোন বারই দেখা পেলাম না। কি এক অজ্ঞাত কারনে বর্ষন সর্বদা গাড়ির পিছনের সিটে বসে। আর ওখানে রোদ ঠেকানোর জন্য কালো একটা পর্দা দেওয়া। ওরা রোদ থেকে বাচে আমি অস্থিরতা থেকে বাচিনা। আর প্রতিদিন এক সময়ে দাড়াতে দেখে আম্মু দিল এক বকা। পরে আর দাড়াইনি। তাছারা সেই অভিমানের রাতে বর্ষনের গান আমাকে নতুন উদ্দিপনা আমাকে এনে দিল। অনেকদিন ধরে ও কিছু লিখছেনা পুরোনোগুলোই গাচ্ছে। আজ ও নতুন একটা গাইলো। প্রত্যেকটা লাইনে একটা করে চমক, কিন্তু বিশেষ একটা লাইন শিষ কেটে গেল আমার হৃদয়ে।
" আমরা বারবার হেরে যাই, নিয়তী দেয় ফাকি
আমরা বারবার ভুলে যাই, এখনো সময় অনেক বাকি "
সত্যিতো এখনো সময় অনেক বাকি। অনেক অনেক বাকি । মাত্রতো শুরু। যদি এখন না হয় আগামী বছর, নাহলে ১০ বছর পর না হলে ২০ বছর পর, না হলে ৫০ বছর,দেখা হবে। নাহলে পরকালে। দেখা হবেই, কারন সময় অনেক বাকি। এই কথাটা সত্যি আমরা ভুলে যাই। কিন্তু সেটা একদম ভুলে যাওয়া যাবেনা।
বাবা-মা ভেবেছেন কক্সবাজার যাবেন। আমি যেতে রাজি হয়নি। কিন্তু বাসায় একে ফেলে যাবেনা তারা। বাধ্য হয়ে যেতে হলো, একসপ্তাহ বর্ষনকে দেখবোনা, হতেই পারেনা। থাকবো কিভাবে! তারপরেও গেলাম। উপায় নেই।
সকল মাল জিনিষ যখন গাড়িতে উঠাচ্ছিল, আমি দাড়িয়েছিলাম। আর বর্ষনকে ভাবছিলাম। আমার চোখে পানি ছলছল করছিল। এর মধ্যেই দেখি সামনের বিল্ডিং থেকে একটা ছেলে গিটার কাধে নিয়ে হেটে আসছে। আর চুইংগাম খাচ্ছে। আমার মাথা পুরো নষ্ট হয়ে গেল। এত সুন্দর মানুষ কিভাবে হয়। আল্লাহ আমাকে রক্ষা করো। এই ছেলেকে চোখের সামনে অন্যকোনো মেয়ে নিয়ে যাবে তা একটা মেয়ে হয়ে আমি দেখতে পারবোনা। যেভাবে হোক ওকে আমাকে পাইয়ে যাও।
মনে মনে বলছি বর্ষন দেখ একবার দেখ, আমি চোখে কাজল দিয়েছি। টেনে টেনে। কেমন লাগছে দেখ। মনে মনে জিকির করছি। ও সমানে হেটেই যাচ্ছে। হঠাত করে ফিরে তাকালো। আমার বুকে ছ্যাত করে উঠলো।
কক্সবাজের সপ্তাহটাতে কাটলো আমার জীবনের সেরা দিনগুলো। সারাদিন ওকে ভাবলাম আর ওর চেহারা মনে করে পানিতে ভিজে থাকলাম। আমি ওকে পাবই। কারনা আমি সবার থেকে আলাদা। সবাই ওর রুপ দেখে পছন্দ করবে কিন্তু আমি না দেখেই পছন্দ করেছি কিন্তু দেখার পর আর নিজেকে সামলাতে পারছিনা কেন ?
খোদা দাও দাও আমাকে শক্তি দাও।
আর ওকে পাইয়ে দাও।
বাড়ি ফিরে এলাম, মন করছে আনচান আনচান। কখন ওর গান শুনবো। রাত হলো, ১২ টা বাজলো ও গান গায় না। একদিন, দুইদিন, কতদিন। অসুস্থ নাতো? কি হলো? পারলাম না থাকতে। গিয়ে খোজ নিলাম। বাসার দাড়োয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম, এই বাসার একটা ছেলে আছে, গান গায় ওর কি হয়েছে।বললো " ওরা বাসা চেঞ্জ করে চলে গিয়েছে। কোথায় গিয়েছে কেউ বলতে পারলোনন নিজেকে বাংলা ফিল্মের নায়িকার মত অসহায় মনে হচ্ছে।
প্রচুর কাদলাম, একমাস, দুইমাস। অনেক মাস।
পরে ওর গানই আমাকে সাত্তনা দিল।
............আর এখনো সময় অনেক বাকি।
আর শুরু হলো, ওর সাথে আমার দেখা হয়ে যাওয়ার।অপেক্ষা।
যেখানেই যাই ভাবি ওর সাথে দেখা হয়ে যাবে।
হয়নি। হয়না।
এই গল্প প্রায় ১৩ বছর আগের। বর্ষনের গান শুনেই গানের উপর আগ্রহ বাড়ে। বাবার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করলাম কিছু বন্ধু ও বান্ধবীদের নিয়ে। গানের আলবাম প্রডিউস কম্পানি। কত নতুন নতুন শিল্পী এল,গেল, বর্ষনের মত কেউ গেলনা।
একদিন একটা এপলিকেশন এল। ৮ টা গান গিয়ে একটা আলবাম করবে বলে। আলবামের নাম " সেবার শহরের ঝড়ে" । নাম শুনেই বুক ছ্যত করে উঠলো। এটা বর্ষনের গানের একটা লাইন।
" সেবার শহরের ঝড়ে ভেজা রজনীগন্ধায়
তোর স্মৃতি আর নিকোটিন একাকী সন্ধায়।"
আমি ছেলেটাকে দেখা করতে বললাম।
ছেলেটা রুমে এসে ঢুকলো, আমি চমকে উঠলাম, বর্ষন আমার বর্ষন।
কিন্তু একি ওর সাথে মেয়েটা আবার কে ?
একদম ভালো হচ্ছেনা।
এ জ্বালাটা আবার এল কোথা থেকে।
বর্ষন আর আমি, সেটাইতো হবে।
তাহলে এই মেয়ে কে ?
" আপনি ?"
" আমি শাওন( বর্ষনের আসল নাম), আর ও আমার গার্লফ্রেন্ড নীল। আপনি আমাকে গানের ব্যাপারে আসতে বলেছিলেন"
" জিনা, আমি কোনো গান বের করবো না। আজ থেকে এই কম্পানি বন্ধ হয়ে যাবে, আপনি আসতে পারেন।"
বর্ষনের মুখ লাল হয়ে গেছিল। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। কিছুই করার নেই। আরেকটা মেয়ের গায়ের স্মেল যার গায়ে তাকে আমি ভালো কেন বাসবো, বাসবো না। একদম ভালোবাসবো না।
No comments:
Post a Comment