সখি ভালোবাসা কারে কয়

মধ্যবৃত্তরা বরাবর একটা গ্যাড়াকলের ভিতরে থাকে। গ্যাড়াকলের উপরে থাকে বড়লোক আর নিচে থাকে গরীব। বড়লোক কিছু করলে সেটা বেশ ভালো একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়ায় আর গরীবরা করলে ফালতু কাজ। দু'টোতে পাত্তা না দিলেই চলে, কিন্তু যেকোন কাজ মধ্যবৃত্তরা করুকনা কেন তা নিয়ে বিশালাকার সমালোচনার সৃষ্টি হয়। আর এই তত্ত্ব অনেক আগে থেকেই বাবার মুখে শুনে আসছে সীমা। তাই সীমা সর্বদা প্রেম নামক যন্ত্রনাময় শান্তির প্রলোভন থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। বেশ কয়েকবার ভালোবাসার ডাক পেলেও সাড়া দেওয়াটাকে একদম ব্যঞ্চনিয় মনে করেনি।
কিন্তু সব যুদ্ধের একটা শেষ আছে। সীমা কি করবে কিছু ভেবে পাচ্ছেনা। কোচিং এর সব থেকে সুন্দর ছেলেটা তাকে প্রপোজ করেছে, যেখানে গাড়ি নিয়ে আসা মেয়েরাও ছেলেটার জন্য পাগল। ওদের রেখে ছেলেটা কেন সীমাকে পছন্দ করলো সে উত্তর সীমা পায় না খুজে। হতে পারে, ওর ভিতরে যে স্পেশালিটি অর্থাত সততা বা মায়া মায়া ভাবটা  ছেলেটার ভালো লেগেছে। বা সীমা যেমন মনে মনে সর্বদা এই ছেলেটার মত একটা ছেলেকে স্বামী হিসেবে পাবে বলে ভেবে এসেছে, ছেলেটার হয়তো সপ্নকন্যা একদম সীমার মতো।

বান্ধবীরা খুব করে বলছে, না করে দিতে। ছেলেটা নাকি ভালো না। ওকে ছেড়ে দিতে পারে। কিন্তু ঠিক কেন জানি  সীমার কথাগুলো বিশ্বাস হয়না। বারবার মনে পরছে, প্রানবন্ত আন্তবিশ্বাস নিয়ে ছেলেটা ওকে ভালোবাসার কথা জানিয়েছে।
" এই মেয়ে, আমি না তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। "
" আমি কি করতে পারি "
" তুমিও আমাকে ভালোবাসে ফেলতে পারো, ঠিক যেভাবে আমি তোমাকে ফেলেছি। তুমি হয়তো জাননা কিভাবে, কিন্তু কদিন বেশ ভেবে দেখেছি আসলে কেন তোমাকে আমি ভালোবাসি। এখানে একটু বিজ্ঞাপন বিরতী, আমি নার্ভাস ফিল করছি একটু পানি খেয়ে নেই। আচ্ছা বিরতীর পর ফিরে আসলাম। কোথায় যেন ছিলাম। হ্যা, কিভাবে ভালোবাসলাম, এখানে একটু ডেসটিনি। পুরো পোগ্রামটা বোঝার জন্য তোমাকে একটু সময় দিতে হবে। তুমি বরং তোমার ফোন নাম্বারটা দাও, আমি রাতে ফোন দিয়ে বুঝিয়ে দিব।"
এরই মধ্যে ক্লাসে স্যার চলে এসেছে। পুরো সময়টা ছেলেটা বিভিন্ন ভঙ্গিতে সীমাকে দেখার চেষ্টা করছে। সীমা বিভিন্ন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না। সে এক অস্বাভাবিক ক্রিয়া। মনে হচ্ছে কোন ঐশ্বরিক শক্তি জোর করে সীমাকে টেনে হেছড়ে নিয়ে ছেলেটার সামনে দাড় করাচ্ছে।নিমিষেই তৈরী হচ্ছে হাজার রকমের কল্পনা। হাত পাও বাধা সীমার, আর ছেলেটা চোখ দিয়েই ধর্ষন করছে। এটা প্রাথমিক ধর্ষন, সীমার তাই মনে হলো। ছেলের স্বাদ মেটেনি, আরও দরকার।
" আর কি চাও তুমি ?"
" এবার চাই, গায়ের স্মেল "
" আমি কিন্তু জামাকাপর কিছু খুলতে পারবোনা"
" দরকার নেই, চুলটা ছেড়ে দাও ঘাড়ের কাছে, নিশ্বাস নিয়ে ১৫ সেকেন্ড আটকে রাখ, আর পালা করে এভাবে নিশ্বাস-প্রশ্বাস করতে থাকো।
তাহলে কি হবে?
তোমার শরীর ঘাম ছাড়বে। গলায় গিয়ে থমকে যাবে তোমার সুবাশ,  আরও প্রানবন্ত করবে তোমার আলটুসি চুলের বাহারি সুবাস। আমার ঠিক এই ড্রাগটাই চাই।
ধুপ করে সীমার ঘোর ভেঙ্গে গেল। ক্লাস শেষ হয়ে গেছে। সবাই এলোমেলো হয়ে গেছে। কেউ কোচিং ছাড়ছে, কেউ ডেক্সের উপরে বসে আছে। কেউ জালনায় গিয়ে গান গাচ্ছে।
হঠাত ছেলেটা আসলো, নীল পাঞ্জাবি পরা।
" কি, কি কি ? বল তুমি আমায় ভালোবাস কিনা ?"
" আমার একটু সময় লাগবে "
" ওকে, ৫ মিনিট দিলাম "
" না, এতে হবে না, আরও লাগবে "
" আচ্ছা ১০ মিনিট"
" উহ, তুমিতো বেশ অস্থির। আরও সময়।"
" আচ্ছা সারাজীবন দিব, কিন্তু আগে বল, তোমার কি মনে হয়, হ্যা বলবে আমাকে।"
" এ আবার কেমন কথা।"
" এটাই কথা। ধর আজ যাওয়ার সময় যদি তুমি মারা যাও, আমি কিভাবে বুঝবো তুমি আমাকে ভালোবাসতে কিনা। অবুঝ হয়ে থাকতে পারবোনা।"
" আচ্ছা হ্যা।"
" কি ? "
ছেলেটা ধুপ করে জরিয়ে ধরলো সীমাকে। সীমা একটুও অপ্রস্তুত হলোনা। মনে হলো, ও এটাই চাইছে। সীমাও জরিয়ে ধরলো। পুরো নাটকটা শেষ হলো এক মিনিটে। কোচিং এর অন্য পোলাপাইনের চোখ ছানাবরা।
ছেলেটার নাম রাজীব। রাজীব আগেপরে বেশ কয়েকটা প্রেম করেছে। সত্যি কথা বলতে কি একটাও মন দিয়ে করিনি। করা লাগে তাই করেছে। যখন ভালোলাগেনি সরে এসেছে, কিন্তু সীমার ব্যাপারটা একদম আলাদা। রাজীব সত্যি সীমাকে প্রচন্ড ভালোবাসে, কেন রাজীব নিজেও জানেনা। কেন যেন মনে হলো, এই মেয়েকে ভালোবাসাটা ওর জন্য ফরয হয়ে গেছে। রাজিব রচন্ড অস্থির একটা ছেলে। সাথে সাথেই প্রপোজ করে বসলো এবং সীমা রাজীও হলো।
আর এভাবেই কাটতে লাগলো রাজীব সীমার প্রেমময় জীবন। একটু একটু করে প্রত্যেকটা প্রেম রাজীব শেখালো সীমাকে। কিভাবে রিক্সায় চড়তে হয়, কিভাবে হাত ধরতে হয়, কিভাবে খাইয়ে দিতে হয়, কিভাবে লুকিয়ে ফোন করতে হয়, কিভাবে কিস করতে হয় ইত্যাদি নানান জিনিষ। প্রেমের বয়স হয়ে এল ১ বছর। দিন দিন রাজীব জরিয়ে পরলো সীমার আরও গভীরে।
সীমাও রাজীবকে পেয়ে গর্ববোধ করতো। যেখানে অন্য মেয়েরা রাজীবের জন্য পাগল সেখানে রাজীব সারাদিন ওর দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। সীমার যে কি ভালো লাগেনা। বাকা ঠোটে অন্যমেয়েদের অভিমান গলে পরে। সীমার ইচ্ছে করে রাজীবকে কোলে শুইয়ে রাখতে।
সেকেন্ড ইয়ারে উঠে গেছে সীমা। উঠতেই একটা চমক, একদিনে তিন প্রপোজ়। আর গানিতিক হারে সীমার প্রপোজ় বাড়তেই লাগলো। একদিন একটা ছেলে বাইক নিয়ে এসে রিক্সা থামিয়ে প্রপোজ় দিল। স্টাইলটা সীমার জোশ লাগলো। ছেলেটা ভার্সিটিতে পরে। সিমাকে বেশ কয়েকবার প্রপোজ দিল। না , হ্যা কিছুই বললো না সীমা।
রাজীবের সাথে প্রচন্ড ঝগড়া সেদিন সীমার। সামনে আসছে পরীক্ষা। রাজীব ব্যস্ত থাকায় ঠিকমত সময় দিতে না পারায় সীমার অসহ্য লাগছে। ওই দিন বাইক বয় আবার প্রপোজ করলো। কি এক কারনে সীমা হ্যা করে দিল ছেলেটা বললো,
"আজ কোচিং না করে আমার সাথে একটু ঘুরতে যাবে। অনেক কথা আছে তোমার সাথে।"
বিকেলে কোচিং এ যাবার সময় বাইকবয় ওকে পিছন থেকে ডাক দিল, সীমা পিছন আসতে লাগলো, আর ভাবছে, কি করছি আমি এসব, কেন করছি। আমার রাজীব শুনলে অনেক কষ্ট পাব। রাজীব আর যাই করুক রাজীব অনেক সৎ। এটা করা আমার একদম উচিত না, কিন্তু কি এক অজানা কারনে সীমা ছেলেটার বাইকের দিকে এগিয়ে গেল। ঊঠেও পরলো।
ধানমন্ডি লেকে বসে আছে বাইক বয় আর সীমা।
" কি ভাবছো? "
" কিছু না, এমনি "
" আচ্ছা, তোমার কি বয় ফ্রেন্ড ছিল আগে?"
" হিম, রাজীব, আমার সাথেই পরে "
" ও, তাই বুঝি, এরকম বোকামী তোমার থেকে আশা করা যায় না। সেম এইজে কেউ প্রেম করে নাকি। এগুলো থাকেনা। দেখ আমার তোমার ৬ বছরের পার্থক্য আমি চাইলেই তোমাকে বিয়ে করতে পারবো,  ওই ছেলে পারবেনা।"
সীমার কিছু ভালোলাগছে না। নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। রাজিবের সাথ এগুলো করা একদম উচিত না।
দিন দিন পরীক্ষা এগিয়ে আসছে আর রাজীব আরও ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে একটু একটু ওদের দুরত্ত বারছে। আর ঠিক এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে বাইকবয়। প্রতিদিন ফোন দিয়ে অনেক কথা হচ্ছে তার সীমার সাথে, সীমাও রাজীবের উপর জেদ ধরে দিনের পর দিন ডেটিং মারছে বাইক বয়ের সাথে। হঠাত করে রাজীব একদিন জানতে পারলো।
" কেন ?"
" ইচ্ছে, তাই। তোমার সমস্যা কি "
" আমার কোনো সমস্যা না, সেটা মুখে বলতে হবে না। কাজেই দেখতে পারবে। আর শোনো কয়টা প্রপোজ পেলেই ভেবনা ভালোবাসে সবাই। আজকের সীমাকে এই স্থানে এনেছে রাজীব। তোমার সাথে আমার মেলামেশা থেকে সবাই সীমাকে চিনেছে। আজ তারা তোমাকে চাচ্ছ। চাবে, রাজীবের কিতসু যায়ও না আসেও না।
এই কথা শুনে সীমা ফোন কেটে দিল। বাইক বয়কে ফোন দিল। এর পর থেকে রাজীবের ফোন বন্ধ, দু দিন পর সীমা ফোন দিল। কিন্তু রাজীবের ফোন খোলা পেলনা। সীমা ফোন দিয়েই গেল। সারা রাত সারাদিন সীমা ফোন দিতেই থাকলো। একা থেকে সীমা বুঝতে পারলো ও রাজীবকে কতট আভালোবাসে। সব কিছু ছেড়ে দিল সীমা। হয়ে গেল আবার সেই আগের সীমা। যত প্রপোজই আসুকনা কেন একদম গায়ে লাগায় না সীমা। দিন গুনতে লাগলো আবার কবে রাজীবের সাথে দেখা হবে তার।
ভালোবাসার ঘনত্ত বুঝানোর জন্য একা থাকতে দেওয়া উচিত। কিন্তু আমরা সেইটাই দিতে পারিনা, আমরা পায়ে ধরি, কান্নাকাটি করি, তাকে প্রশয় দেই আর হারিয়ে ফেলি। কিন্তু যদি আমরা একটু একা থাকার সুযোগ করে দেই তাহলেই ঠিক সে হেরে যায়। আর হেরে গেলেই বুঝতে পারে
.........সখি ভালোবাসা কারে কয়।



No comments:

Post a Comment