লাল শাড়ি আর জিনস প্যান্ট

ভীষন শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঠিক কি কারনে শব্দটা হলো বোঝা যাচ্ছে না। বাম দিকের দেয়ালে টিকটিকিটা ঠিক সেভাবেই তাকিয়ে আছে, একই স্থানে, যেখানে কাল রাতেও ছিল। টিকটিকিটা কথা বলার চেষ্টা করছি কাল রাতে । কি যে বলার চেষ্টা করছে,অনেক ভেবেও বের করা হয়নি। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরেছি। যদিও কাল রাতে টিকটিকিটাকে দেখে আর মশারী টানিয়ে ঘুমালাম না। কেন যেন মনে হল, মশারী টানালে ওর বেশ অভীমান হবে। আর ওর অভীমানের পাত্তা দিতে গিয়ে কাল রাতে মশার সাথে বড়সড় যুদ্ধ করতে হয়েছে। আড়মোড় ভেঙ্গে ঘুম থেকে উঠলাম। বেড শিটে তাকিয়ে দেখি,বেশ কয়েকটা মরা মশা পরে আছে। আমি একবার টিকটিকির দিকে তাকালাম। ওগুলো আর ফেললাম না। এসে হয়তো মশাগুলোকে আর খুজে পাওয়া যাবেনা।


টি এস সি চত্তরে বসে আছি। কয়েকদিন ধরে প্রায় আনাচে কানাচে একটা লাল শাড়ী পরা মেয়েকে দূর থেকে দেখি। কাছে গেলে আর খুজে পাই না। কিন্তু মেয়েটাকে খুব চেনা মনে হয়। আইল্যান্ডে বসতে বসতে দুটো ঝাল মুড়ি নিলাম। একটা খাচ্ছি আরেকটা পাশে রেখে দিছি। কাল্পনিক তাকে খেতে দিলাম আরকি। এই একটা ব্যাপারে নিজেকে বেশ শান্তি দেওয়া যায়। পছন্দের ও মনের মতো কাউকে কল্পনা করে বেশ আনন্দদায়ক সময় কাটানো যায়।
আইল্যান্ড বেয়ে হেটে আসছে তিনটা মেয়ে। মাঝখানের মেয়েটার সাথে আমার কল্পনার মেয়েটার অনেক মিল। কিন্তু মাঝখানের মেয়েটা জিনস,ও গেঞ্জি পরে আছে। আর কাল্পনিক মেয়েটা লাল শাড়ি। আমার পাশে ঝালমুড়ি দেখে ওরা ফিস ফিস করে কথা বলছে। আর হাসছে। একটু কাছে এগিয়ে আসতেই মাঝের মেয়েটা বললো " ছ্যাকা খেয়ে বিরহে এমন কাতর হয়ে গেছে। তাই বিচ্ছেদিনীকে কল্পনা করে আনন্দ উপভোগ করছে।" টিজ করলো জিনস পরা মেয়ে।
" আমি এমিব্যার সাথে প্রেম করি, খালি চোখে দেখা যায় না" রিপ্লাই দিলাম।
ওরা আবার হাসছে। আর আমার পাশের বসে পরলো। অবশ্যি দুরত্ত্ব রেখে। নিজেরা কি যেন বলাবলি করছে। আমি আমার মতো ঝাল মুড়ি খাচ্ছি, আর লুকিয়ে লুকিয়ে জিনস মেয়েটাকে দেখছি। সে এখন বাম পাশে। আমার দিকে। মেয়েটাও একটু খানি আমার দিকে তাকালো।
রাস্তার ওপাশ থেকে লাল শাড়ি পরা একটা মেয়ে এগিয়ে আসছে। আমার প্রচুর ভয় হলো। সেই মেয়েটা নাতো যাকে এতক্ষন পাশে বসিয়ে রেখেছি। মেয়েটা এসে আমার পাশে বসে পরলো, একদম গায়ে গায়ে মিশিয়ে। আমি বেশ অবাক হলাম। অপ্রস্তুত হয়ে জিনস মেয়েটার দিকে তাকালাম। ওর চোখ আরও বড় হয়ে গেল। আমার পাশে মেয়ে দেখে এত অবাক হবার কি আছে। পাশে মেয়ে বসানোর যোগ্যতা কি এখনো হয় নি  আমার।
মেয়েটা আমার ঝাল মুড়ি খেতে খেতে বললো " কি অবস্থা তোমার "
আমি বললাম "ভাল, তোমার ? "
" এইতো, তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে।"
" ধন্যবাদ, অনেক অপেক্ষা করালাম তাই না?"
" না বেশী কই, এখানে আমি আধাঘন্টা।"
লালশাড়ি আমার হাত ধরলো। আঙ্গুল দিয়ে অনুভুতি ছড়াতে লাগলো। আমিও ওর হাত ধরলাম। পাশের মেয়েগুলো সরে আরও দূরে চলে গেল। ওরাও অপমানিত বোধ করছে।
ওরা যেতেই আমি বললাম " আপনাকে ঠিক আমি চিনতে পারলাম না "
লালশাড়ি বললো " চেনার দরকার নেই। স্টেট বসে থাকুন।"
" কিন্তু কেন এই অভিনয় ?"
" ঐ যে সামনের আইল্যন্ডে দেখুন লাল জামা পরা একটা ছেলে দেখছেন। হ্যা করে তাকাবেন না। হ্যা ওটাই। আমার প্রেমিক। প্রেম হলো এক বছর আজ বলে কিনা ওর নাকি আগে একখানা প্রেম ছিল। আরে তাহলে আগে কেন বলনি। আমিতো গেলাম রেগে। বললাম আমারও ছিল এবং এখনো আছে।বলে এসে পরলাম। আপনি একা দেখে বসে পরলাম। আপনি ভাই অনেক চালাক, এমন ভাবে আমার সাথে কথা বললেন, যেন মনে হলো সাত জন্মের প্রেম।

এই গল্প শুনে লাল শাড়ির উপর দিয়ে প্রেম উঠে গেল। চোখ খুজতে লাগলো, জিনস প্যান্টের মেয়েটাকে। এইতো আগের জায়গাতেই আছে।
" আপনি বোধহয় ঐ তিনজনের একজনকে পছন্দ করেন।"
" আমি মাথা ঝাকালাম, জিনস পরা মেয়েটাকে "
" ভালো ভালো, আমি তাহলে যাই, পরে ঐ মেয়ে আবার কষ্ট পাবে।
লাল শাড়ী চলে গেল,
আমি একটা আইস্ক্রিম নিয়ে বসে রইলাম। জিনস মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মিনিটে একটা পলক ফেলছে। আরেকটা আইস্ক্রিম নিয়ে এগিয়ে গেলাম। ওর সাথের মেয়েগুলো অনেক আগেই চলে গেছে।
" নিন, খান "
ও নিল, খাচ্ছে। কোথায় যেন তাকিয়ে আছে।
" আচ্ছা, আপনি কি কাউকে ভালোবাসেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
" বাসি কিন্তু আজ থেকে আর বাসবো না"
" ও মা! কেন কেন ?"
" এমনি ইচ্ছে হলো"
" ও আচ্ছা"
"আপনি একটা সাহায্য করবেন?"
" হ্যা করবো, বলুন"
" আপনি ওকে বলে দিবেন যে আমি ওর সামনে আর আসবোনা। আর ওকে ভালোবাসবো না। ওর যদি লজ্জা থাকে বা আমার উপরে সম্মান অথবা ভালোবাসা থাকে তাহলে ও যেন আমার সামনে না আসে। পারবেন?"
"  হ্যা পারবো। কাকে বলতে হবে?"
" ওই যে বট গাছটা দেখছেন। ওখানে যান, দেখবেন সাদা পাঞ্জাবি পরা একটা ছেলে, চোখে চশমা। ঝাল মুড়িওয়ালার সাথে কথা বলছে। যান তাড়াতাড়ি যান।"
আমি এগিয়ে গেলাম। মনে মনে একটূ বেশ ভালো লাগছে। লালশাড়িতো আমায় ছেড়ে গেল আরেক ছেলের কাছে। ওখানে কোনো আশা নেই , কিন্তু এই মেয়েতো তার প্রেমিককে ছেড়ে দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে একটা আশা থাকে।
আমি পিছনে তাকিয়ে দেখি, মেয়েটা নেই। আমি ভাবলাম ভয়ে লুকিয়েছে। আমি বটগাছের নিচে গিয়ে দাড়ালাম। কিন্তু সাদা পাঞ্জাবি পরা, চোখে চশমা দেওয়া কোন ছেলেকে দেখা যাচ্ছে না। কি করি এখন। পিছনে তাকিয়ে জিনস মেয়েটাকেও খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। আজব । এখন কি করি। পাশে দেখি ঝাল মুড়ি ওয়ালা। ভাবলাম এই লোকতো অনেকক্ষন এখানে। এর কাছে জিজ্ঞেস করি।
" আচ্ছা ভাই, এখানে সাদা পাঞ্জাবি পরা, চোখে চশমা  এমন লোক দেখেছেন ?
লোকটা তাকিয়ে আছে, বললো " এখানে সাদা পাঞ্জাবি আর চশমা চোখে লোকতো একমাত্র আপনাকেই মনে হচ্ছে।"
আমি থমকে গেলাম।


No comments:

Post a Comment